আন্তর্জাতিক ডেস্ক | SKN International
জেনেভা, ১০ অক্টোবর ২০২৬: চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে ২.৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা UNCTAD। সংস্থাটির ৯ অক্টোবর প্রকাশিত Trade and Development Report 2026 অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৯ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধির হার ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগের ওপর চাপ বিশ্ব অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যনীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে।
কেন কমছে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি?
UNCTAD-এর বিশ্লেষণে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কয়েকটি প্রধান চাপের কথা উঠে এসেছে।
১. মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সংকট
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কারখানা পরিচালনা, কৃষি, পণ্য পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো তখন উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিকল্পনা সীমিত করতে পারে।
২. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যয় বৃদ্ধি
সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, জাহাজের জ্বালানি ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা আমদানি-রপ্তানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এতে পণ্য সরবরাহে দেরি হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের বেশি দাম দিতে হতে পারে।
৩. ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বাণিজ্যনীতি
বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং কৌশলগত স্বার্থকে কেন্দ্র করে নীতিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। UNCTAD-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সরাসরি বাণিজ্য ২০ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার ও বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।
৪. বিনিয়োগ ও আর্থিক বাজারের অনিশ্চয়তা
জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ব্যবসায়িক আস্থা দুর্বল করতে পারে। ঋণের খরচ বেশি থাকলে নতুন কারখানা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্পে বিনিয়োগের গতি কমে যেতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিও কমতে পারে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৪.৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
যদিও এই হার উন্নত অর্থনীতিগুলোর তুলনায় বেশি, তবু উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে রয়েছে ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, ঋণ পরিশোধের ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি। দেশভেদে এসব সমস্যার মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন ব্যয় সামলানো কঠিন করে তুলতে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্য বাড়লেও কেন অর্থনীতি ধীর?
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গতি কমার পূর্বাভাস দেওয়া হলেও পণ্য ও সেবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি থেমে যাচ্ছে না।
UNCTAD-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে স্থির মূল্যে বিশ্ব বাণিজ্য প্রায় ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের মোট মূল্য রেকর্ড ৩৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল।
তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাণিজ্যের আর্থিক মূল্য বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উচ্চ জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যমূল্য। অর্থাৎ, বাণিজ্যের মোট ডলারের পরিমাণ বাড়লেই যে একই হারে পণ্যের প্রকৃত পরিমাণ বা উৎপাদন বাড়ছে, তা নয়।
অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, সার্ভার এবং ডেটা সেন্টারের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কিছু খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহায়তা করছে। তবে এই সুবিধা সব দেশ ও শিল্পে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমার প্রভাব শুধু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে খাদ্যপণ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হতে পারে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন কর্মী নিয়োগ কমতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা দুর্বল হলে রপ্তানিনির্ভর শিল্পের অর্ডার ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সব দেশের পরিস্থিতি এক হবে না। যেসব দেশ প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি, উৎপাদনশীলতা এবং রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনতে পারবে, তারা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয়, আমদানি করা জ্বালানি এবং শিল্পের কাঁচামালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ দেশের আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে ভোক্তাদের চাহিদা দুর্বল হলে রপ্তানি আদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এই প্রভাবের প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে জ্বালানির দাম, বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতির ওপর।
বিশেষজ্ঞদের নীতিগত আলোচনায় রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, নতুন বাজার তৈরি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য অর্থায়ন সহজ করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
UNCTAD-এর বার্তা: প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন
UNCTAD-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো, শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উন্নয়নের সুফল বিভিন্ন দেশ, অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে কতটা ছড়িয়ে পড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির সুবিধা যদি অল্প কিছু দেশ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে ধনী দেশগুলোর ব্যবধান কমানো কঠিন হতে পারে। এ কারণে শিল্পায়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে সংস্থাটি।
সার্বিক মূল্যায়ন: ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখলেও তার গতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আগামী দিনে সংঘাতের স্থায়িত্ব, জ্বালানির মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনই বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।