সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ক্রয়কৃত জমি মাপজোখ করতে না পারা, পৌরসভার নির্ধারিত কার্যক্রম স্থগিত হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন জমির ক্রেতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক দলের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, জমি মাপজোখের প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
জমি ক্রয়ের পর মাপজোখ নিয়ে জটিলতা
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, শাহজাদপুর উপজেলার ইসলামপুর (ডায়া) গ্রামের বাসিন্দা মোঃ আব্দুল আজিজ জমি-জমাসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে ১০ অক্টোবর ২০২০ তারিখে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করেন বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটির একটি অনুসন্ধানী দল মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে।
অভিযোগকারীর দাবি, সংশ্লিষ্ট জমিটি ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি এবং বৈধ আমমোক্তারনামার মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। দলিলে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে ৫২২৩ নম্বরের একটি অপরিবর্তনীয় পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল সম্পাদনের কথা বলা হয়েছে। তবে দলিলের বৈধতা, মালিকানার ধারাবাহিকতা, জমির সঠিক পরিমাণ ও বর্তমান রেকর্ড সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস এবং রেজিস্ট্রি অফিসের নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
জমির ক্রেতার অভিযোগ, সম্পত্তি কেনার পর স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি এবং জমি মাপজোখে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ পরিস্থিতিতে শাহজাদপুর পৌরসভায় জমি মাপার আবেদন করা হলে সেটি মঞ্জুর হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
নির্ধারিত তারিখে মাপজোখ না হওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জমি মাপার দিন নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত দিনে পৌরসভার সার্ভেয়ার বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা মাপজোখ করতে উপস্থিত হননি বলে অভিযোগকারীরা জানান।
তাঁদের দাবি, ১৩ সেপ্টেম্বর জমির বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ ফৌজদারি আদালতে দায়ের করা মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জমি মাপজোখ বন্ধ রাখার আবেদন করে। পরদিন ওই আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পারেন।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, আবেদনটি গ্রহণ করা আর জমি মাপজোখ স্থগিতের আনুষ্ঠানিক আদেশ দেওয়া কি একই বিষয়? তাঁদের দাবি, স্থগিতাদেশ মঞ্জুরের কোনো লিখিত নথি তাঁরা দেখতে পাননি এবং মাপজোখ বন্ধের বিষয়টিও জমির ক্রেতাকে যথাযথভাবে জানানো হয়নি।
তবে আবেদন গ্রহণ, স্থগিতাদেশ জারি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নোটিশ দেওয়ার প্রকৃত অবস্থা জানতে পৌরসভার নথি ও আদেশপত্র যাচাই করা জরুরি।
জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ
১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জমিসংক্রান্ত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র উপস্থাপন করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়ে শাহজাদপুরের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন। তাঁদের আরও দাবি, জেলা প্রশাসক লিখিত আবেদনসহ বিষয়টি যথাযথভাবে নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করতে বলেন।
জেলা প্রশাসকের দপ্তরের লিখিত নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য জানা যাবে।
ইউএনওর কার্যালয়ে গিয়ে কী ঘটেছিল?
অনুসন্ধানী দলের দাবি, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে তাঁরা শাহজাদপুর পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও সাবরিনা শারমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি কার্যালয়ে আছেন বলে জানালে দলটি সেখানে যায়।
তবে কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর ইউএনওকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায় বলে দাবি করেছেন দলের সদস্যরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিসংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও অন্য একজন কর্মকর্তাকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন এবং নিজের সন্তান অসুস্থ থাকায় বাসায় যেতে হবে বলে স্থান ত্যাগ করেন।
পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনের সময় অনুসন্ধানী দলের সদস্যদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
দলের সদস্যদের দাবি, পরে ইউএনও দুঃখ প্রকাশ করে তাঁদের বাসায় যেতে বলেন এবং বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। তাঁরা সেখানে গিয়ে মামলার বাদীপক্ষের কয়েকজন ব্যক্তি ও স্থানীয় লোকজনকে উপস্থিত দেখতে পান বলে জানান। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি দপ্তরে নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়টি ব্যক্তিগত বাসায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন, কী আলোচনা হয়েছে এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য কী—এসব বিষয়ে স্বাধীন যাচাই ও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। ইউএনওর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
আদালত অবমাননা-সংক্রান্ত মামলায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল?
প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, শাহজাদপুর সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের বিচারক মোঃ সানু আকন্দ ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে ইউএনও সাবরিনা শারমিনের বিরুদ্ধে আদালতের আদেশ অমান্য এবং আদালত ও বিচারক সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে উচ্চতর আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। আরও দাবি করা হয়েছে, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে উচ্চতর আদালত পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল করে ইউএনওর লিখিত আপত্তি গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্চতর আদালতের আদেশে ঠিক কী বলা হয়েছে, কোন আদালত আদেশ দিয়েছেন এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা-সংক্রান্ত নির্দেশের বর্তমান আইনগত অবস্থান কী—তা সংশ্লিষ্ট রায় বা আদেশের প্রত্যয়িত অনুলিপি দেখে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। আদালতের কোনো পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল হওয়া বা লিখিত আপত্তি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া মানেই সব অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নথি যাচাই ছাড়া দেওয়া যায় না।
জমির বিরোধ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, জমির মালিকানা ও মাপজোখের বিষয়টি সরকারি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি না হওয়ায় তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁদের দাবি, জেলা প্রশাসকের দপ্তরে অভিযোগ জানানোর পরও সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি।
এ ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে:
১. পৌরসভা জমি মাপার আবেদন মঞ্জুর করার পর নির্ধারিত দিনে মাপজোখ কেন হয়নি?
২. মাপজোখ স্থগিতের কোনো আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি হয়েছিল কি না?
৩. সংশ্লিষ্ট জমির দলিল, রেকর্ড, দখল ও মালিকানার বিষয়ে ভূমি প্রশাসনের অবস্থান কী?
৪. জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকলে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ কী নেওয়া হয়েছে?
৫. আদালত-সংক্রান্ত মামলার বর্তমান অবস্থা কী এবং ওই মামলার সঙ্গে জমি মাপজোখের আইনগত সম্পর্ক কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি, আদালতের আদেশ, ভূমি অফিসের রেকর্ড এবং প্রশাসনের বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
জমির ক্রেতা ও অনুসন্ধানী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, জমির কাগজপত্র যাচাই এবং আইন অনুযায়ী মাপজোখের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
একই সঙ্গে ইউএনও সাবরিনা শারমিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি), শাহজাদপুর পৌরসভা, সংশ্লিষ্ট মামলার পক্ষগুলো এবং জেলা প্রশাসনের বক্তব্য জানা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; আর অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। একাধিক ভাবে তাহাকে ফোন দিয়ে ঘটনাটি জানার জন্য অনেক বার কল দেওয়া হয়েছিল ফোন রিসিভ করেননি অনুসন্ধান চলছে অনুসন্ধান চলছে