আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন ও যাচাইয়ের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় অভিমুখে মিছিল করেছে বিরোধী দলগুলোর জোট INDIA bloc। মিছিল থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার Special Intensive Revision (SIR) কার্যক্রম প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
মিছিলটি সংসদ ভবন এলাকা থেকে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে এগিয়ে গেলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকে দেয়। পরে কয়েকজন বিরোধী নেতা ও সংসদ সদস্যকে পুলিশ আটক করে। তাদের মধ্যে কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এবং তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন নেতাও ছিলেন। আটক ব্যক্তিদের অনেককেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ব্যারিকেডে উঠে জাতীয় পতাকা ওড়ালেন রাহুল
মিছিলের সময় পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বিরোধী নেতাদের আটকে দিলে রাহুল গান্ধী একটি ব্যারিকেডের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা নাড়েন। পরে পুলিশ তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ অন্য নেতারাও সেখানে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ করেন।
বিক্ষোভকারীরা নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এমন প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে, যাতে বৈধ ভোটারদের একটি অংশ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
কী নিয়ে এত বিতর্ক?
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের Special Intensive Revision (SIR) কার্যক্রম। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা যাচাই, মৃত ভোটার, একই ব্যক্তির একাধিক নাম এবং অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথমে বিহারে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম পরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে।
বিরোধী দল ও বিভিন্ন অধিকারকর্মীর অভিযোগ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহের জটিলতার কারণে প্রকৃত ও বৈধ ভোটারদের নামও বাদ পড়তে পারে। তাদের আশঙ্কা, এতে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, অযোগ্য ও ডুপ্লিকেট নাম বাদ দিয়ে তালিকাকে আরও নির্ভুল করাই এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য। বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
নির্বাচন কমিশনের ভেতরের মতপার্থক্যের খবর
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের ভেতরেও মতপার্থক্যের খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনের দুই সদস্য কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এ বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টেও বিষয়টি
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্ক ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও গড়িয়েছে। আদালত নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিষয়টি নিয়ে জবাব চেয়েছে এবং আইনবহির্ভূত কোনো সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছে।
আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন ছাত্র ও নাগরিক সংগঠনও বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে গত কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে।
ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও সরকার যেখানে এটিকে ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে, সেখানে বিরোধীরা এটিকে ভোটাধিকার ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে।
তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।