বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন এলেই আমরা নানা স্লোগান শুনি—কেউ বিএনপিকে নিয়ে কটাক্ষ করেন, কেউ আওয়ামী লীগকে ‘খুনি-দুর্নীতিবাজ’ বলে আখ্যা দেন, আবার কেউ জামায়াতকে ‘রাজাকার’ বলে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করেন। দল বদলায়, সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়; কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি সত্যিই বদলায়?
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয়—ক্ষমতার মানুষ বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলায় না।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। কেউ বলে দ্রব্যমূল্য কমাবে, কেউ বলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করবে, কেউ কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা বলে, কেউ দুর্নীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয়। জনগণও আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়িত হয়—সেটিই বড় প্রশ্ন।
আজ একজন সাধারণ মানুষ রিকশায় উঠলে ভাড়ার চাপ অনুভব করেন। বৃষ্টির দিনে কোথাও কোথাও স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। বাজারে গিয়ে মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। দুধে পানি মেশানো, মাছ সতেজ দেখাতে বরফের অতিরিক্ত ব্যবহার কিংবা খাদ্যে ভেজালের মতো অভিযোগও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ায়।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন আছে। একজন রোগী চিকিৎসকের কাছে গিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার বোঝা বহন করছেন—এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। চিকিৎসা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন; এটি যেন কোনোভাবেই অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে।
ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অভিযোগও নতুন নয়। একটি কাগজ ঠিক করতে গিয়ে কখনো একজনকে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে হয়, কখনো দালালনির্ভরতার অভিযোগ ওঠে। সরকারি সেবা যদি নাগরিকের অধিকার হয়, তাহলে সেই সেবা পেতে কেন সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত হয়রানি বা অর্থব্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে?
এখানেই আসল প্রশ্ন—শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই কি দেশ পরিবর্তন হয়?
দেশ পরিবর্তন করতে হলে আগে পরিবর্তন করতে হবে আমাদের কর্মসংস্কৃতি, দায়িত্ববোধ এবং নাগরিক আচরণ। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, একজন চিকিৎসক যদি রোগীর প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন, একজন ব্যবসায়ী যদি ভেজালমুক্ত পণ্য দেন, একজন পরিবহন শ্রমিক যদি ন্যায্য ভাড়া নেন এবং একজন নাগরিক যদি নিজের দায়িত্ব পালন করেন—তাহলেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে বদলাবে।
দেশটি শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নয়। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী কিংবা অন্য যে দলই ক্ষমতায় আসুক—জনগণের মৌলিক প্রত্যাশা একই: নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সুশাসন, কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী জীবনযাপন এবং দুর্নীতিমুক্ত সরকারি সেবা।
রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে গালি দেওয়া সহজ; কঠিন হলো নিজের দলের ভুল স্বীকার করা। অন্যের দুর্নীতি তুলে ধরা সহজ; কঠিন হলো নিজের দলের দুর্নীতিবাজকে শাস্তির আওতায় আনা। বিরোধী দলের অন্যায় দেখানো সহজ; কঠিন হলো ক্ষমতাসীন দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও একইভাবে দাঁড়ানো।
তাই আজ প্রয়োজন স্লোগানের রাজনীতি নয়—জবাবদিহির রাজনীতি।
আমরা চাই না, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে শুধু চেয়ার বদলাবে, কিন্তু অফিস-আদালত, বাজার, হাসপাতাল, পরিবহন কিংবা প্রশাসনের পুরোনো অনিয়ম একইভাবে চলতে থাকবে।
দেশের পরিবর্তন শুরু হোক প্রত্যেকের নিজ নিজ কর্মস্থল থেকে। একজন শিক্ষক তাঁর দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করুন, একজন কর্মকর্তা ঘুষ ছাড়া সেবা দিন, একজন ব্যবসায়ী সঠিক ওজন দিন, একজন চিকিৎসক প্রয়োজনীয় চিকিৎসাই দিন, একজন চালক ন্যায্য ভাড়া নিন এবং একজন রাজনীতিবিদ জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির হিসাব দিন।
সরকার বদলানো রাজনৈতিক পরিবর্তন; কিন্তু মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্কৃতি বদলানোই প্রকৃত রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন।
এসকেএন টিভি মনে করে—দেশকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে হলে ‘কে ক্ষমতায়’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, ‘ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, জনগণের জন্য সে কী করছে?’
বাংলাদেশের মানুষ আর শুধু স্লোগান শুনতে চায় না। তারা চায় নিরাপদ রাস্তা, ন্যায্য ভাড়া, ভেজালমুক্ত খাবার, সাশ্রয়ী চিকিৎসা, ঘুষমুক্ত সরকারি সেবা এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
রাজনীতির রং ভিন্ন হতে পারে, দল ভিন্ন হতে পারে, মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে—কিন্তু জনগণের অধিকার সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।
সত্যিকারের পরিবর্তন তখনই হবে, যখন সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিও বদলাবে।