নিজস্ব প্রতিবেদক |বাংলাদেশ থেকে
২০১৭ সালের একটি চাঁদাবাজি মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকায় সরকারি দপ্তরে তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এক লাখ টাকা চাঁদাবাজির মামলা করা হয়। মামলার এজাহারে একজনের নাম উল্লেখ থাকলেও পরবর্তী সময়ে দাখিল করা অভিযোগপত্রে আরও দুজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাঁদের মধ্যে দৈনিক সময়ের কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের নামও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, মামলাটি সম্পর্কে তাঁরা দীর্ঘদিন অবগত ছিলেন না। ২০২৫ সালে মানিকগঞ্জে তাঁদের নামে মামলা থাকার বিষয়টি জানতে পারেন। পরে মামলাসংক্রান্ত গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কাগজপত্র তাঁদের হাতে আসে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন। তবে এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে মামলার মূল নথি ও আদালতের আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি দপ্তরে তথ্য সংগ্রহ, এরপর চাঁদাবাজির মামলা
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সরকারি দপ্তরে অনিয়মের অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকেরা ঢাকায় যান। ওই সময় মোঃ মোখলেসুর রহমান নামের এক সরকারি কর্মচারীর দপ্তরে তথ্য সংগ্রহের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এক লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ওই সরকারি কর্মচারীর পদবি হিসেবে উচ্চমান সহকারী কাম-হিসাবরক্ষক উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে ধামরাই এলাকায় কর্মরত বলে জানানো হয়েছে। তবে তাঁর নামের সঠিক বানান, বর্তমান কর্মস্থলের নির্দিষ্ট দপ্তর এবং মামলার সঙ্গে তাঁর ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এজাহারে একজন, অভিযোগপত্রে তিনজনের নাম
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মামলার প্রাথমিক এজাহারে একজনের নাম থাকলেও পরবর্তী সময়ে অভিযোগপত্রে আরও দুজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যাঁদের নাম পরে যুক্ত হয়েছে, তাঁদের দাবি, তাঁরা মামলার বাদীকে চিনতেন না এবং ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা ছিল না।
এখন প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগপত্রে অতিরিক্ত দুজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ ছিল? তদন্ত কর্মকর্তা তাঁদের বিরুদ্ধে কী সাক্ষ্য, নথি বা অন্যান্য উপাদান পেয়েছিলেন? এজাহার ও অভিযোগপত্রের মধ্যে নামের পার্থক্যের কারণ কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং তদন্তসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা জরুরি। অভিযোগপত্রে কারও নাম থাকা নিজে থেকেই তাঁর অপরাধ প্রমাণ করে না; অপরাধের বিষয়টি আদালতে প্রমাণিত হতে হয়।
শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বর্ণনা অনুযায়ী, মোঃ মোখলেসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না বলে জানান। তাঁর বক্তব্যের বর্ণনায় উঠে এসেছে, তিনি একজনকে চিনতেন; তবে দৈনিক সময়ের কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদকের নাম কেন মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা তিনি জানেন না। এ বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা ভূমিকা রেখে থাকতে পারেন বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড, সঠিক প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মামলার বাদী ও তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া জরুরি, যাতে অভিযোগের সব দিক সামনে আসে।
২০২৫ সালে মামলা জানার দাবি, ভোগান্তির দায় কার?
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০১৭ সালের মামলার বিষয়ে ২০২৫ সালে জানতে পেরে তাঁরা আইনি জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়েন। মামলাসংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ, আদালতে হাজিরা বা অন্যান্য আইনি পদক্ষেপের কারণে অর্থ ও সময় ব্যয় হয়ে থাকলে তার প্রতিকার কীভাবে পাওয়া যাবে—এ প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা।
বিশেষ করে কোনো সাংবাদিক বা সংবাদপত্রের সম্পাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সাংবাদিকেরা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কোনো দপ্তরে গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে; তবে সেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে আইনসম্মত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
অন্যদিকে, সাংবাদিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না। অভিযোগের ভিত্তি থাকলে তা যথাযথ প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইভাবে, কারও নাম ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে তার প্রতিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
এই ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের প্রধান প্রশ্ন—তদন্তে ভুল, অনিয়ম বা বেআইনি হয়রানির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায় কার ওপর বর্তাবে? দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতায় আর্থিক ক্ষতি, পেশাগত সুনামহানি ও সময়ের অপচয় হয়ে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কীভাবে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবেন?
এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মামলার নথি, আদালতের চূড়ান্ত আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তা, বাদী বা তদন্তকারীকে প্রমাণ ছাড়া দায়ী করা সমীচীন নয়। তবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী জবাবদিহি ও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথি যাচাইয়ের দাবি
ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত:
১. মামলার এজাহারে কার নাম ছিল এবং অভিযোগপত্রে অতিরিক্ত দুজনের নাম কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল?
২. যাঁদের নাম পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কী তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল?
৩. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে মামলার খবর বা আদালতের নোটিশ যথাসময়ে পৌঁছেছিল কি না?
৪. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়ে থাকলে তা কোন আদালতের আদেশে এবং কী প্রক্রিয়ায় হয়েছিল?
৫. তদন্তে অনিয়ম বা বেআইনি হয়রানি প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কীভাবে প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবেন?
দৈনিক সময়ের কণ্ঠ মনে করে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই এ ধরনের ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আনা সম্ভব। মামলার মূল নথি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।