নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিআরটিএ’র এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দালালচক্রের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেন, সাময়িক বরখাস্তের পর রহস্যজনকভাবে পদোন্নতি এবং নতুন কর্মস্থলে ফের অনিয়মের সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিআরটিএ’র কর্মকর্তা মোহাম্মদ জমির হোসেন (পরিচিতি নং: ২০১৪২০০০১৫)।
অভিযোগ অনুযায়ী, একসময় মোটরযান পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দালালদের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগে তিনি প্রশাসনিক শাস্তির মুখে পড়েন এবং সাময়িক বরখাস্ত হন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই শাস্তির প্রভাব কাটিয়ে কীভাবে তিনি পদোন্নতি পেলেন—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
বর্তমানে তিনি বিআরটিএ যশোর সার্কেলে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সাতক্ষীরা সার্কেলের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন বলে জানা গেছে।
দালালচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
চলতি বছরের ২ জানুয়ারি বিআরটিএ সদর দফতর থেকে কার্যালয়গুলো দালালমুক্ত রাখতে নির্দেশনা জারি করা হয়। এরপরও তৎকালীন ঢাকা জেলা সার্কেল (ইকুরিয়া)-এ দায়িত্ব পালনকালে জমির হোসেনের বিরুদ্ধে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি গাবতলী ড্রাইভিং লাইসেন্স কেন্দ্রে বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযানে কয়েকজন দালাল নগদ অর্থসহ আটক হওয়ার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে এ ঘটনায় জমির হোসেনের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর আওতায় তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়। এরপর ৪ মার্চ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শাস্তির বদলে পদোন্নতি—প্রশ্ন প্রশাসনে
সাময়িক বরখাস্ত থাকা একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে পদোন্নতির প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হলো—এটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি পদোন্নতির সুযোগ পান।
এমনকি অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে বিষয়টি ম্যানেজ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যশোর-সাতক্ষীরায় নতুন সিন্ডিকেটের অভিযোগ
বর্তমানে যশোর ও সাতক্ষীরা সার্কেলের দায়িত্বে থাকা জমির হোসেনকে ঘিরে ফের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, রুট পারমিটসহ বিভিন্ন সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং দালালনির্ভর একটি চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি দিয়ে সরাসরি সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও দালালদের মাধ্যমে কাজ করালে দ্রুত সেবা পাওয়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
‘অর্থের বিনিময়ে পার পেয়ে গেলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা কোথায়?’
সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন—কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত ও শাস্তির প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় তিনি কীভাবে আবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদোন্নতি পান? যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এর পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছেন এবং কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে জমির হোসেনকে আইনের ও প্রশাসনিক বিধিবিধানের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি তাকে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা দরকার।
বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ জমির হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে পদোন্নতির নথি, বিভাগীয় মামলার নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।